ঘরমুখো মানুষে কানায় কানায় পূর্ণ সদরঘাট
দক্ষিণাঞ্চলগামী যাত্রীদের স্বস্তির ঈদযাত্রা শুরু
পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে নাড়ির টানে বাড়ি রাজধানী ছাড়তে শুরু করেছে দক্ষিণাঞ্চলের ঘরমুখো মানুষ। প্রতি বছরের মতো এবারও দক্ষিণবঙ্গের প্রবেশদ্বার খ্যাত সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে দেখা গেছে ঘরমুখো মানুষের উপচেপড়া ভিড়। গতকাল সদরঘাট থেকে ১২৫ থেকে ১৩০টি লঞ্চ ছেড়ে গেছে বলে জানা গেছে। আসন্ন ঈদুল ফিতর সামনে রেখে রাজধানীর প্রধান নদীবন্দর সদরঘাটে যাত্রীদের চাপ আরও বাড়বে। এবারের ঈদে নদীপথে প্রায় ৫ থেকে ৮ লাখ মানুষ দেশের বিভিন্ন জেলায় যাতায়াত করবেন। এদিন সদরঘাট থেকে দক্ষিণাঞ্চলের বরিশাল, ঝালকাঠি, বরগুনা, পটুয়াখালী, ভান্ডারিয়া, আমতলী, ভোলা, মনপুরা, ভাসানচর, চাঁদপুর, ডামুড্যা, বেতুয়াসহ বিভিন্ন রুটে লঞ্চ ছেড়ে গেছে বলে জানা যায়।
এদিকে দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন পথে সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে যাত্রীর ব্যাপক ভিড় দেখা গেছে। পরিবার-পরিজন নিয়ে অনেকেই লঞ্চে বাড়ির পথে রওনা হয়। যাত্রীরা জানায়, এখন পর্যন্ত সরকার নির্ধারিত ভাড়ায় টিকিট পাওয়া যাচ্ছে, তবে ডেক ও কেবিনে যাত্রীসংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। সকাল থেকেই সদরঘাট টার্মিনাল এলাকায় যাত্রীদের ব্যাপক উপস্থিতি লক্ষ করা গেছে। সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভিড়ও বাড়তে থাকে। বিশেষ করে পটুয়াখালী, ভোলা, বরগুনা ও বরিশালগামী লঞ্চগুলোতে যাত্রীদের চাপ সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে। অনেক যাত্রীকে ঝুঁকি নিয়ে লঞ্চের ছাদেও উঠতে দেখা গেছে।
যুগ্মপরিচালক মোবারক হোসেন আরো বলেন, যাত্রীদের নিরাপদ, স্বস্তিদায়ক ও নির্বিঘ্ন যাত্রা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) এরই মধ্যে নানা প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। বিআইডব্লিউটিএ’র ঢাকা নদীবন্দর সদরঘাটের নৌ-নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বিভাগের যুগ্ম পরিচালক মুহাম্মদ মোবারক হোসেন বলেন, ঈদকে কেন্দ্র করে সদরঘাটসহ আশপাশের এলাকায় যাত্রীদের নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল যাত্রা নিশ্চিত করতে আগাম পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, প্রতি বছর ঈদকে ঘিরে নদীপথে যাত্রীর চাপ কয়েকগুণ বেড়ে যায়।
বিষয়টি বিবেচনায় রেখে এবার সদরঘাটের পাশাপাশি বসিলা ও কাঞ্চন সংলগ্ন এলাকা থেকেও লঞ্চ চলাচলের ব্যবস্থা করা হয়েছে, যেন সদরঘাটে অতিরিক্ত চাপ কমে। এসব ঘাট থেকে প্রতিদিন ছয়টি করে লঞ্চ ছেড়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, বর্তমানে প্রায় ১৭০টির মতো লঞ্চ যাত্রী পরিবহনের জন্য প্রস্তুত। এর মধ্যে ৩৮টি রুটের মধ্যে ৩৩টি রুটে লঞ্চ চলাচল করছে।
ঢাকা নদীবন্দর থেকে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫৫ থেকে ৬০টি লঞ্চ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাচ্ছে। তবে গতকাল ১২৫টি লঞ্চ ঢাকা বন্দর ছেড়েছিল। তিনি বলেন, ঈদ যাত্রাকে নিরাপদ রাখতে র্যাব, নৌ-পুলিশ, ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো যৌথভাবে দায়িত্ব পালন করবে। সদরঘাট এলাকায় ৪ থেকে ৫টি নিয়ন্ত্রণ কক্ষ বা কন্ট্রোল রুম সার্বক্ষণিক চালু থাকবে। এছাড়া মাঠ পর্যায়ে মোবাইল টিম ও মোবাইল ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্ব পালন করবেন।
বিআইডব্লিউটি এর বন্দরের পরিচালক আলমগীর হোসেন বলেন, সদরঘাটে যাত্রীদের অন্যতম অভিযোগ কুলি হয়রানি। এ সমস্যা সমাধানে এবার নির্দিষ্ট পোশাক পরিহিত অনুমোদিত কুলিদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া যাত্রীদের জন্য ট্রলি সেবার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে, যেন তারা নিজেরাই মালামাল বহন করতে পারেন। অসুস্থ, অক্ষম বা বয়স্ক যাত্রীরা কুলিদের সহায়তা নিতে পারবেন। ঈদ যাত্রায় অসুস্থ, বৃদ্ধ ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন যাত্রীদের জন্যও বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
প্রতিটি প্রবেশ ফটকে হুইলচেয়ারের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে এবং প্রশিক্ষিত ক্যাডেটদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, যারা এসব যাত্রীকে নিরাপদভাবে লঞ্চ পর্যন্ত পৌঁছে দিতে সহায়তা করবেন। পন্টুন এলাকায় যাত্রীদের টানাটানি, ক্যানভাসিং ও হকারদের উৎপাত বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। এবারে পন্টুন এলাকা ক্যানভাসার ও হকারমুক্ত রাখা হবে। কেউ যাত্রীদের জোর করে লঞ্চে তোলার চেষ্টা করলে তার বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ভাড়ার বিষয়ে তিনি বলেন, সরকার নির্ধারিত ভাড়া অনুসরণ করা হবে এবং কোনোভাবেই অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করতে দেওয়া হবে না। এরই মধ্যে লঞ্চ মালিকেরা যাত্রীদের স্বস্তির জন্য প্রায় ১০ শতাংশ পর্যন্ত ভাড়া কম নিচ্ছেন।
ভোলাগামী যাত্রী রফিকুল ইসলাম বলেন, ঈদের সময় বাসে গেলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থাকতে হয়। তাই পরিবার নিয়ে লঞ্চে যাচ্ছি। কিন্তু আজ ঘাটে অনেক ভিড়, লঞ্চেও জায়গা পাওয়া কঠিন। দুপুরে বরগুনাগামী আরেক যাত্রী মাহবুব আলম জাগো নিউজকে বলেন, ডেকে বসার জন্য আগেই চলে এসেছি। কিন্তু এত ভিড় যে তিল ধারণের জায়গা নেই। তারপরও পরিবারের সঙ্গে ঈদ করতে বাড়ি যাওয়ার আনন্দটাই বড়। বরিশালগামী যাত্রী নাসরিন আক্তার বলেন, শিশুদের নিয়ে এসেছি, তাই একটু ভোগান্তি হচ্ছে। তবে নদীপথে যাত্রা তুলনামূলক স্বস্তিদায়ক বলেই লঞ্চে যাই।
রাজধানীর সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল থেকে দক্ষিণাঞ্চলগামী যাত্রীদের ঈদযাত্রা স্বস্তিতে শুরু হয়েছে। গতকাল টার্মিনালে তেমন যাত্রী ভোগান্তি দেখা যায়নি। দুপুরে সদরঘাট টার্মিনালে গিয়ে দেখা যায়, যাত্রীরা পরিবার-পরিজনসহ টার্মিনালে আসছেন। তাঁরা নিজ নিজ লঞ্চের ডেক ও কেবিনে অবস্থান নিচ্ছেন। বেলা দুইটার পর থেকে যাত্রীর চাপ বাড়তে শুরু করে।
হুলারহাট, পটুয়াখালী, বরগুনা, হাতিয়া, চাঁদপুর, শরীয়তপুর, ভোলা ও ইলিশা রুটে যাত্রী উপস্থিতি তুলনামূলক বেশি ছিল। এমভি রাজদূত প্রাইম লঞ্চের ব্যবস্থাপক সাইদুর রহমান বলেন, সন্ধ্যা সাতটায় সদরঘাট থেকে ভান্ডারিয়া রুটে আমাদের একটি লঞ্চ ছেড়ে যাবে। ঈদ মৌসুমের তুলনায় আজ যাত্রীসংখ্যা স্বাভাবিক।
আগামীকাল থেকে যাত্রীর চাপ বাড়তে পারে। বগাগামী এ আর খান লঞ্চের যাত্রী শাহীন মিয়া বলেন, ৎআজকে খুব একটা ভিড় পাইনি। শান্তিতে টিকিট নিয়ে লঞ্চে উঠতে পেরেছি। পরিবার নিয়ে আরামেই বসে আছি। আশা করি ভালোভাবেই বাড়ি পৌঁছাতে পারব।











