ভাইরাল 'তাজু ভাই' আসলে কার কথা বলছেন?
হাসি-ঠাট্টার আড়ালে জনতার কণ্ঠস্বর
কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়ন। ব্রহ্মপুত্র নদের কোল ঘেঁষে জেগে থাকা এই চরাঞ্চলের মানুষের জীবন সংগ্রাম যতটা কঠিন, নাগরিক সুযোগ-সুবিধা ততটাই সীমিত। এই চরেরই সন্তান তাইজুল ইসলাম, যার সরল ও বিনয়ী উপস্থাপনা এখন নেট দুনিয়ায় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
সম্প্রতি স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে নারায়ণপুর বাজারে জিলাপি বিক্রি নিয়ে তাইজুলের একটি ভিডিও ভাইরাল হয়। বিক্রেতাকে তার সাধারণ প্রশ্ন— “জিলাপি আজকে কত করে বেচতেছেন সরকারি রেটে?”—শুনতে অদ্ভুত বা হাস্যকর মনে হলেও, এর ভেতরে লুকিয়ে ছিল ভোক্তা অধিকার ও বাজারের স্বচ্ছতার এক জোরালো দাবি। যা অনেক পেশাদার সাংবাদিকের নজর এড়িয়ে যায়, তাইজুল তা তুলে ধরেছেন অতি সাধারণ ভঙ্গিতে।
তাইজুলের ব্যক্তিগত জীবন সিনেমার গল্পের চেয়েও কঠিন।
শিক্ষাজীবন: স্কুলে যাওয়ার সুযোগ হয়নি কখনো।
পরিবার: বাবা-মা দুজনেই শ্রবণপ্রতিবন্ধী। ৬ ভাই-বোনের বড় হওয়ায় পুরো সংসারের ভার তার কাঁধে।
পেশা: জীবিকার তাগিদে রাজমিস্ত্রির সহকারী হিসেবে কাজ করেন ঢাকায়।
কাজের ফাঁকে ফাঁকে মোবাইলের ক্যামেরায় তিনি তুলে ধরেন তার এলাকার মানুষের অভাব-অভিযোগ। তিনি স্পষ্টভাবেই বলেন,
“আমি সাংবাদিক না। সাংবাদিকরা আমাদের চরের খবর করেন না, তাই আমি নিজেই ভিডিও করি। লোকে আমাকে নিয়ে ট্রল (হাসাহাসি) করলেও কষ্ট নেই, আমি শুধু চাই আমাদের চরের মানুষের উন্নয়ন হোক।”
প্রথাগত সাংবাদিকতা বনাম ‘তাজু ভাই’
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাইজুলের ফলোয়ার সংখ্যা ৬ হাজার থেকে মুহূর্তেই ৯০ হাজারে গিয়ে ঠেকেছে। তার ভিডিওটি দেখেছেন প্রায় ৫৫ লক্ষ মানুষ।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, তার এই আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তার মূল কারণ তার সরলতা ও আন্তরিকতা। যেখানে মূলধারার সংবাদমাধ্যম অনেক সময় প্রান্তিক মানুষের ছোট ছোট সমস্যাগুলো এড়িয়ে যায়, সেখানে তাইজুল নিজেই নিজের এলাকার মুখপাত্র হয়ে দাঁড়িয়েছেন।
চরের মানুষের প্রতিনিধি
তাইজুল ইসলাম কেবল একজন ‘ভাইরাল কনটেন্ট ক্রিয়েটর’ নন; তিনি বর্তমান সময়ের সেই ডিজিটাল নাগরিক, যিনি বিনোদনের মোড়কে সমাজ সংস্কারের কাজ করছেন। তার ভিডিওগুলো প্রমাণ করে যে, সাধারণ মানুষের অধিকার নিয়ে কথা বলতে দামি ক্যামেরা বা বড় ডিগ্রির প্রয়োজন নেই, শুধু মানুষের প্রতি ভালোবাসা এবং সাহসের প্রয়োজন।
নারায়ণপুরের চরাঞ্চল থেকে উঠে আসা এই কণ্ঠস্বরটি এখন আর শুধু হাসি-ঠাট্টার পাত্র নয়, বরং এটি প্রান্তিক মানুষের এক শক্তিশালী প্রতিচ্ছবি।

























